
বিশেষ প্রতিবেদকঃ বরিশাল গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলমকে ঘিরে আবারও অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও গণপূর্ত কার্যালয়ে স্বস্তি ফেরেনি বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা। তাদের অভিযোগ, সরকারি কর্মকর্তা হয়েও মো. ফয়সাল আলম দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক পরিচয় বহন করেছেন এবং সেই প্রভাব ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে নিয়মবহির্ভূত সুবিধা দিয়ে আসছেন।
ঠিকাদারদের অভিযোগ অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনকালে মো. ফয়সাল আলম নৌকার ব্যাজ পরিধান করতেন এবং নিজেকে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিতেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি কৌশলে নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, এখন তিনি নিজেকে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ে উপস্থাপনের চেষ্টাও করছেন, যাতে ক্ষমতা ও প্রভাব অক্ষুণ্ন থাকে।
বরিশাল গণপূর্তে কাজ করা একাধিক ঠিকাদার জানিয়েছেন, কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিয়ম ভেঙে বারবার কাজ পাচ্ছে। বিশেষ করে খান বিল্ডার্স ও খান ট্রেডার্স নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একচেটিয়াভাবে প্রকল্প পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি না থাকলেও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় তাদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
সাধারণ ঠিকাদার আব্দুর রহিম বলেন, ঝালকাঠিতে দায়িত্ব পালনকালের মতো একই ধরণের অনিয়ম বরিশালেও চলছে। তার ভাষায়, নিয়ম মানা ঠিকাদাররা পিছিয়ে পড়ছেন, আর নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান নিয়মের তোয়াক্কা না করেই কাজ পাচ্ছে। আরেক ঠিকাদার তসলিম মৃধা অভিযোগ করেন, সরকারি কর্মকর্তা হয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বহন করা এবং গোপন সমঝোতার মাধ্যমে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি ও অনৈতিক।
একাধিক টেন্ডারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা বা সক্ষমতা নেই, তাদের দরপত্র প্রথমে বাতিল করা হলেও পরে যৌথ উদ্যোগ দেখিয়ে আবার কাজ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ঠিকাদারদের মতে, এটি টেন্ডারের শর্তের সরাসরি লঙ্ঘন। এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করলে গণপূর্ত কার্যালয়ে বাকবিতণ্ডা হয় এবং প্রতিবাদী ঠিকাদারদের লাইসেন্স বাতিলের হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঠিকাদার এটিএম আশরাফুল হক রিপন জানান, তিনি শুধু প্রশ্ন তুলেছেন—ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি না থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে টেন্ডারে অংশ নিচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কাউকে হুমকি বা অপমান করা হয়নি। তবে মো. ফয়সাল আলমের দাবি, কয়েকজন ঠিকাদার তার অফিসে এসে তাকে হুমকি দিয়েছেন।
মো. ফয়সাল আলম ৩২তম বিসিএসের একজন কর্মকর্তা এবং ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা। ঝালকাঠিতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সে সময়ও নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, কমিশন বাণিজ্য ও নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনেও অভিযোগ জমা পড়েছিল বলে জানা যায়, যদিও সেগুলোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বরিশালে বদলির পরও ঠিকাদারদের অভিযোগ, অনিয়ম থামেনি। বরং নতুন জায়গায় এসে একই কৌশলে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এই অবস্থার মধ্যেই ২০২৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি বরিশালের নবগঠিত ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) কমিটিতে ভাইস চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব নেন। এই পদ পাওয়ার পর তার প্রভাব আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
ঠিকাদারদের আরও অভিযোগ, বরিশাল গণপূর্তে কাজ পেতে হলে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গোপন সমঝোতায় যেতে হয়। এতে করে সাধারণ ঠিকাদাররা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। নিয়ম মেনে দরপত্র জমা দিয়েও তারা কাজ পাচ্ছেন না, যা স্পষ্টভাবে বৈষম্যমূলক আচরণ।
সংবাদ প্রকাশের আগে মো. ফয়সাল আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত না হলে সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অনিয়ম স্থানীয় ঠিকাদারদের আস্থা নষ্ট করছে এবং সরকারি প্রকল্পের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বরিশাল গণপূর্তে ন্যায্য প্রতিযোগিতা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়বে।

