বিশেষ প্রতিবেদক : পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ কবিরকে ঘিরে একের পর এক অনিয়ম, আর্থিক অসঙ্গতি ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। অভিযোগ উঠেছে, দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্রকল্পে অগ্রিম বিল প্রদান, দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে। এ কারণে তাকে ঘিরে প্রশাসনিক মহলে নানা আলোচনা চলছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাশেদ কবির এর আগে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগের ধানমন্ডি সাবডিভিশনে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকার বিভিন্ন কাজের বিল প্রদান প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ওই সময়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। পরবর্তীতে শাহ আলম ফারুক চৌধুরীর দেশত্যাগের বিষয়টি নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান কর্মস্থল পাবনা গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব নেওয়ার পর রাশেদ কবিরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা সিদ্ধান্ত এখনো পাওয়া যায়নি।
চাকরিচ্যুত প্রকৌশলীকে ১৮ লাখ টাকার বেশি বেতন-ভাতা প্রদান নিয়ে প্রশ্ন :
দপ্তরসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, পাবনা গণপূর্ত বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মো. শাহীন উদ্দিন ও মো. ফজলে হক অসদাচরণের অভিযোগে দীর্ঘদিন সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পৃথক আদেশে তাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। এরপর শাহীন উদ্দিন বকেয়া বেতন-ভাতার আবেদন করলে পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ কবির তা সুপারিশসহ জেলা অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসে পাঠান। ওই সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর শাহীন উদ্দিনকে ১৮ লাখ ৮১ হাজার ৪২ টাকা পরিশোধ করা হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার ভিত্তিতে ওই অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে চিঠি দেওয়া হয়।
পাবনা মেডিকেল কলেজ প্রকল্পে অগ্রিম বিলের অভিযোগ : পাবনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের রিমেইনিং ওয়ার্কের দরপত্র এবং বিল পরিশোধ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষ দিকে প্রকল্পের একটি কাজে ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকার বিল কাজের অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে পরিশোধ করা হয়েছে অভিযোগকারীদের দাবি, বাস্তবে কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে অগ্রিম অর্থ প্রদান করা হয়। এ বিষয়ে তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চাওয়া হলেও দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বুয়েটের অধ্যাপক এ কে এম আক্তার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকার একটি ভবন নির্মাণ কাজের বিল অগ্রিম পরিশোধ করা হলে একটি জেলা শহরে বাস্তবায়ন করতে সময়ের বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।
দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন : ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গণপূর্ত বিভাগের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রধান প্রকৌশলীর নির্দেশনা অমান্য করে কিছু কাজ এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এতে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, কয়েকটি দরপত্রের আইডি নম্বর— Id No: 1297074
Id No: 1396658
Id No: 1295473
Id No: 1295309
Id No: 1286844
Id No: 1283767
Id No: 1286240
এসব কাজের দরপত্র খোলা, মূল্যায়ন ও বিল পরিশোধের সময়সীমা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, জুন মাসে অল্প সময়ের ব্যবধানে কয়েকটি বড় অঙ্কের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া পাবনা নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের সমাপ্ত কাজের পর পুনরায় ‘রিমেইনিং ওয়ার্ক’ দেখিয়ে সরকারি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও উঠেছে।
তদন্ত দাবি, বক্তব্য মেলেনি রাশেদ কবিরের :
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, বিল পরিশোধের যৌক্তিকতা এবং দরপত্র প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা স্পষ্ট হবে।
তাদের কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, অতীতে আলোচিত কয়েকজন প্রকৌশলীর মতো রাশেদ কবিরও দেশত্যাগ করতে পারেন। তবে দেশত্যাগের আশঙ্কার বিষয়ে কোনো সরকারি নিষেধাজ্ঞা বা সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ কবিরের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য প্রতিবেদনটিতে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
সম্পাদকঃ আব্দুল মালেক
প্রকাশকঃ এস এম নজরুল ইসলাম বাবু
সম্পাদকীয় ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ রোড নং ৪, বাড়ি নং ৭৮
Copyright © 2025 All rights reserved নতুন দিগন্ত