
বিশেষ প্রতিবেদকঃ নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর সরকারি দপ্তরগুলোতে বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি থাকার কথা থাকলেও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) যেন সেই নিয়ম মানতেই নারাজ। অভিযোগ উঠেছে, এলজিইডির রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী গোলাম মোস্তফা দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নির্বিচারে বদলি ও পদায়ন করে যাচ্ছেন। এ কাজে তাকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করছেন খুলনা বিভাগের চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ শফিকুল ইসলাম এবং প্রকিউরমেন্ট শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ গোলাম ইয়াজদানী।
গত ১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে কাজী গোলাম মোস্তফা প্রধান প্রকৌশলী (রুটিন দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি নিয়মনীতি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা উপেক্ষা করে একের পর এক বদলি ও পদায়নের আদেশ দিতে শুরু করেন। অথচ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিল যে, নির্বাচনকালীন সময়ে কমিশনের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কোনো ধরনের বদলি বা ছুটির আদেশ দেওয়া যাবে না। সেই নির্দেশনা এলজিইডিতে কার্যত উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে দেওয়া একটি আধা-সরকারি পত্রে, যেখানে নির্বাচন ব্যাহত হতে পারে—এমন যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়। এরপরও এলজিইডিতে একের পর এক বদলি ও পদায়ন চলতে থাকায় প্রশ্ন উঠেছে, কে বা কারা এসব সিদ্ধান্তের পেছনে মূল ভূমিকা রাখছেন।
অভিযোগ রয়েছে, সৈয়দ শফিকুল ইসলামকে ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে খুলনা বিভাগে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তিনি সেখানে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন না। বরং তিনি প্রায় সারাক্ষণ প্রধান প্রকৌশলী কাজী গোলাম মোস্তফার কক্ষে অবস্থান করছেন। তার সঙ্গে থাকেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ গোলাম ইয়াজদানী। এলজিইডির ভেতরে আলোচনা রয়েছে, এই দুই কর্মকর্তার পরামর্শ ছাড়া প্রধান প্রকৌশলী কোনো নথিতে স্বাক্ষর করেন না।
এলজিইডির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে জনশ্রুতি রয়েছে, বর্তমানে বদলি ও পদায়ন কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। বড় প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক কিংবা প্রশাসন শাখার মতো ক্ষমতাশালী পদগুলো পাচ্ছেন মূলত যাদের অর্থের জোর বেশি। এই সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আওয়ামী সমর্থিত প্রকৌশলীরা।
এমন অভিযোগও উঠেছে যে, নির্বাচনী আইন অমান্য করে এবং কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই অর্থের বিনিময়ে জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী বদলি ও বড় প্রকল্পের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। এসব প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন মহলকে ‘ম্যানেজ’ করার কথাও শোনা যাচ্ছে, যা এলজিইডির ভাবমূর্তিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের শীর্ষ দুই নেতার প্রভাব খাটিয়ে চাঁদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান কবিরকে আম্পান প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এবং বগুড়া অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী নাসির উদ্দীনকে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া সাবেক প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমের সময় বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কমিটির সদস্য তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ মোশারফ হোসেনকে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়। পরে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর সৈয়দ শফিকুল ইসলাম ও মোঃ গোলাম ইয়াজদানীর আগ্রহে কাজী গোলাম মোস্তফা তাকে আবার সদর দপ্তরে ফিরিয়ে আনেন বলে অভিযোগ ওঠে।
প্রকিউরমেন্ট শাখা নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। মোঃ গোলাম ইয়াজদানী দায়িত্ব নেওয়ার পর এই শাখাটি দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঠিকমতো উৎকোচ না দিলে টেন্ডার অনুমোদনে নানা ধরনের হয়রানি, রি-টেন্ডার বা রি-ইভ্যালুয়েশনের মাধ্যমে কাজ আটকে দেওয়ার অভিযোগ করছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রকৌশলীরা।
আরও অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন আওয়ামী ঘরানার সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত মোঃ গোলাম ইয়াজদানী বর্তমানে নিজেকে বিএনপি অনুসারী হিসেবে তুলে ধরতে চেষ্টা করছেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে উপস্থিত থেকে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
এদিকে সম্প্রতি নির্বাহী প্রকৌশলী (অর্থ) মোঃ জামাল হোসেনকে নিয়োগ ও পদায়ন শাখার দায়িত্ব দেওয়া নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রধান প্রকৌশলীর ওপর চাপ সৃষ্টি করে জোরপূর্বক এই দায়িত্ব নিয়েছেন। এ কাজে তাকে সহায়তা করেছেন সৈয়দ শফিকুল ইসলাম ও মোঃ গোলাম ইয়াজদানী।
মোঃ জামাল হোসেনের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অর্থ শাখার দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি নারী সহকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন এবং নিয়মিত উৎকোচ দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে সন্তুষ্ট না করলে ফাইল আটকে রাখা হয়। এমন পরিস্থিতিতে হয়রানি এড়াতে নারী সহকর্মীরা পালাক্রমে তার জন্য বাসা থেকে খাবার রান্না করে নিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। বিষয়টি বর্তমানে প্রশাসন শাখায় প্রকাশ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব অভিযোগ ও অনিয়ম দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনা হলে ইতোমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ এলজিইডির সুনাম আরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

