
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ মাদুরোর গ্রেফতার প্রমাণ করে ট্রাম্প যা বলেন তা তিনি করেন। এমন মন্তব্য করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। এর আগে ক্ষমতা ছাড়কে মাদুরোকে হুমকি দেওয়া হলেও তিনি তা শোনেননি। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলায় হামলা চালিয়ে তাকে তুলে নিয়ে আসে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মাদুরোর ওপর এতো রাগ কেন তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদেও মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু পারেননি।
একটা সময় পর্যন্ত সংসার চালাতে বাস চালাতেন মাদুরো। ক্রমেই ভেনিজুয়েলার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। ২০১৩ সালে শ্যাভেজের মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট হন তিনি। দীর্ঘদিন ধরেই ভেনিজুয়েলা আর্থিক সঙ্কটে ভুগছে। মাদুরোর নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তারপরেও অবশ্য ২০২৪ সালের নির্বাচনে পুননির্বাচিত হয়েছেন মাদুরো। দেশটির বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, তাদের প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেজই বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। কিন্তু নিজের প্রভাব খাটিয়ে ভোটে কারচুপি করেছেন মাদুরো। মাদুরোর বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়ার কথা ছিল বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর। কিন্তু তাকে ভোটে লড়তে দেওয়া হয়নি। ২০২৫ সালে ভেনিজুয়েলায় ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ’ মাচাদোকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করা হয়।
ট্রাম্পের সঙ্গে মাদুরোর সংঘাত বহু দিনের। ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে মাদকের কারবার চালানোর অভিযোগ তুলেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ভেনিজুয়েলার শরণার্থীদের আমেরিকায় আশ্রয় নেওয়া নিয়েও আপত্তি ছিল ট্রাম্পের। ২০১৩ সালের পর থেকে ভেনিজুয়েলা থেকে বহু মানুষ আমেরিকায় আশ্রয় নিয়েছেন। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটা ঠান্ডা লড়াই ছিলই। সম্প্রতি মাদক চোরাচালান দুই দেশের সম্পর্ককে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যায়। আমেরিকার অভিযোগ, মাদক পাচার এবং অন্যান্য অপরাধের জন্য তেল ব্যবহার করছে ভেনিজুয়েলা। ওই তেল আদতে চুরি করা হচ্ছে ভেনিজুয়েলার বিভিন্ন খনি থেকে। তার পর তা বিক্রি করে সন্ত্রাসী কার্যকলাপে ব্যবহার করা হচ্ছ।
ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়ে সম্প্রতি সে দেশের তেলের ট্যাঙ্কার চলাচলের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ভেনিজুয়েলা সীমান্তে কোনো তেলের ট্যাঙ্কার আসা-যাওয়া করতে পারবে না। ভেনিজুয়েলার সরকারকেও ফের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করেন। তাছাড়া প্রেসিডেন্ট হিসাবে মাদুরোর বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন ট্রাম্প। গত কয়েক মাসে ভেনিজুয়েলাকে ঘিরতে ক্যারিবিয়ান সাগরে বিপুল সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ এবং পরমাণুডুবোজাহাজ মোতায়েন করেছিল আমেরিকা। সর্বক্ষণ দেশটিকে একপ্রকার ঘিরে রেখেছিল মার্কিন বাহিনী। শুক্রবার মধ্যরাত (স্থানীয় সময় অনুসারে রাত ২টা) থেকেই রাজধানী কারাকাসে অন্তত সাতবার বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, প্রেসিডেন্ট একাধিক প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ায় তিনি খুব স্পষ্ট ছিলেন যে, মাদক পাচার বন্ধ করতে হবে এবং চুরি করা তেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত পাঠাতে হবে। তিনি বলেন, মাদুরো সবশেষ ব্যক্তি যিনি বুঝতে পেরেছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যা বলছেন সেটি অর্থবহ। আমাদের সাহসী বিশেষ অপারেটরদের ধন্যবাদ, যারা সত্যিই চমৎকার একটি অভিযান পরিচালনা করেছেন।
পালটা দাবি ভেনিজুয়েলার
আমেরিকার সামরিক পদক্ষেপকে ‘সন্ত্রাসবাদী হামলা’ বলে অভিহিত করেছে ভেনিজুয়েলা। সরকারের দাবি, খনিজ তেল এবং সম্পদ কুক্ষিগত করতেই এই কাজ করেছে আমেরিকা। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই চেষ্টা সফল হবে না বলে জানিয়েছে তারা। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আমেরিকা নিজেদের জ্বালানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ভেনিজুয়েলায় নিজেদের পছন্দের লোক চান ট্রাম্প। কিন্তু বামপন্থী নেতা মাদুরো আমেরিকার অঙ্গুলিহেলনে হাঁটার পাত্র নন। ক্ষমতায় আসার পরই চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান তিনি। অভিযোগ, ভেনিজুয়েলার সম্পদ কুক্ষিগত করার লক্ষ্যেই আসলে এই হামলা চালিয়েছে আমেরিকা। ভেনিজুয়েলাও দাবি করেছে, লক্ষ্য যদি মাদক বন্ধ হয়, তাহলে তেলের ট্যাঙ্কারগুলোকে কেন টার্গেট করছে আমেরিকা? এগুলি ধ্বংস করার একটাই উদ্দেশ্য ভেনিজুয়েলার আয়ের সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে আর্থিকভাবে দেশটিকে আমেরিকার কাছে হার মানতে বাধ্য করা এবং সেখানে মার্কিন সমর্থিত সরকার বসানো।

