
বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউক দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত একটি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে, এখানে চাকরিতে ঢুকেই অল্প কয়েক বছরের মধ্যে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে গেছেন। ঘুষ, অনিয়ম আর ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা রহস্যজনক কারণে আলোর মুখ দেখে না। এমনই এক আলোচিত নাম রাজউকের ইমারত পরিদর্শক নির্মল মালো, যিনি মাত্র সাত বছরে শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্মল মালোর বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া পৌরসভা এলাকায়। তার বাবা নিত্য মালো পেশায় একজন মাছ বিক্রেতা ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্মল মালো একসময় বেকার ও ভবঘুরে জীবন যাপন করতেন। ২০১৮ সালে গোপালগঞ্জের এক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার সুপারিশে ছাত্রলীগের কোটায় রাজউকে ইমারত পরিদর্শক পদে তার নিয়োগ হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই নিয়োগ প্রক্রিয়াও ছিল নিয়মবহির্ভূত—এমন অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই নির্মল মালো ঘুষ ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ। ভবন মালিকদের নিয়মিত ভয়ভীতি দেখিয়ে জিম্মি করে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র ও নকশা অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও ঘুষ না দিলে ভবন ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো বলে একাধিক ভবন মালিক জানিয়েছেন। আবার যেসব ভবনে নকশার ব্যত্যয় ঘটেছে, সেগুলো অর্থের বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করে দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
রাজউকের জোনাল অফিস ৪/৩-এর আওতাধীন দক্ষিণ খান এলাকার আর্মি সোসাইটি রোড, চালাবন, নোয়াপাড়া, আমতলা, কালভার্ট, কেন্দ্রীয় শাহী মসজিদ, আইনুছ বাগ ও কলেজ রোড এলাকায় একাধিক ভবনে নিয়মবহির্ভূত নির্মাণের অভিযোগ উঠেছিল। এসব ভবনের অনেকগুলোতে সাইনবোর্ড ছিল না, শ্রমিক ও পথচারীদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সেফটিনেটও ব্যবহার করা হয়নি। নকশা অনুযায়ী সেটব্যাক না রেখে চারপাশে ইচ্ছেমতো ডেভিয়েশন করা হলেও নির্মল মালো পরিদর্শনের সময় ভবন মালিকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে সবকিছু উপেক্ষা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভবন মালিক জানান, তার ভবনের সব অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও নির্মল মালো ভাঙার ভয় দেখিয়ে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ রাজউকের চেয়ারম্যান বরাবর দেওয়া হলেও রহস্যজনক কারণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই সাত বছরে নির্মল মালো বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে জানা গেছে। বাবার পুরোনো টিনের ঘর ভেঙে পাকা বিল্ডিং নির্মাণ করা হয়েছে। অভিযোগ আছে, প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করে তার বাবা নিত্য মালোকে উপজেলা মৎস্যজীবী লীগের সাধারণ সম্পাদক বানানো হয়, যার ফলে পরিবারের প্রভাব আরও বেড়ে যায়।
কোটালীপাড়ার বাগান উত্তর পাড়া গ্রামে ১০ কাঠা জমির ওপর একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে ইতিমধ্যে কয়েক কোটি টাকা খরচ হয়েছে। নিত্য মালোর স্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেছেন যে বাড়িটি নির্মল মালোরই। ঢাকার আফতাব নগরের ডি-ব্লকের ৫ নম্বর সড়কে লেকভিউ কটেজের সি-২ ফ্ল্যাট প্রায় এক কোটি টাকা দিয়ে নিজের নামে কেনা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
এছাড়া কোটালীপাড়ায় ‘ক্যাফে জয়বাংলা’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি অনুযায়ী, উত্তর পাড়ায় ২০ বিঘা জমির ওপর পোল্ট্রি ফার্ম, কান্দি ইউনিয়নের আমবাড়িতে ৪০ বিঘা জমিতে মাছের ঘের এবং উজিরপুরের সাতলায় ৩৫ বিঘা জমিতে মাছের ঘের রয়েছে নির্মল মালোর নামে ও বেনামে। কুড়িল বিশ্বরোডে একটি প্লট এবং ওয়ারী ও মগবাজারে একাধিক ফ্ল্যাট থাকার কথাও শোনা যাচ্ছে, যার বেশিরভাগই তার স্ত্রী উর্মি সাহা ও পরিবারের সদস্যদের নামে কেনা হয়েছে—আইনের চোখ ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে।
রাজউকের কয়েকজন কর্মচারীর ভাষ্য অনুযায়ী, নির্মল মালো নিয়মিত অফিসে আসেন না। দামি বিদেশি সিগারেট খাওয়ায় তার মাসিক খরচই কয়েক দশ হাজার টাকা, যা তার সরকারি বেতনের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বর্তমানে তিনি রাজউকের মহাখালী জোন (৪/৩)-এ চলতি দায়িত্বে ইমারত পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত।
দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজন হলে অনুসন্ধান চালানো হবে। তবে এত অভিযোগ ও সম্পদের পাহাড় থাকার পরও কীভাবে একজন দশম গ্রেডের কর্মকর্তা এত অল্প সময়ে এত বিপুল অর্থের মালিক হলেন—এই প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা।
সম্পাদকঃ আব্দুল মালেক
প্রকাশকঃ এস এম নজরুল ইসলাম বাবু
সম্পাদকীয় ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ রোড নং ৪, বাড়ি নং ৭৮
Copyright © 2025 All rights reserved নতুন দিগন্ত