
বিশেষ প্রতিবেদক : চাকরির মেয়াদ শেষ হতে বাকি মাত্র এক মাস। অথচ এরই মধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর পদে বসতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের—এমন অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে সরিয়ে ওই পদটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে তিনি বিভিন্ন মহলে তদবির চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশকে নিজের পদোন্নতি-তদবিরের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। এ জন্য অর্থ ব্যয় করে একটি জাতীয় দৈনিকে ব্যানার হেডলাইনে সংবাদ প্রকাশ করানোর অভিযোগও উঠেছে আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি মন্ত্রী, সচিবসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে তদবির চালানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা।
‘মিস্টার ৫%’—কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ : আবুল খায়েরকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প ও গণপূর্তের বড় বড় কাজ থেকে কমিশন বা ‘কাটমানি’ আদায়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঠিকাদার ও প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে কমিশন আদায়ের একটি অলিখিত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন তিনি। এ কারণেই দপ্তরের একটি অংশে তার পরিচিতি তৈরি হয়েছে ‘মিস্টার ৫%’ নামে।
অভিযোগ রয়েছে, গোপালগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রংপুর হয়ে ঢাকা—কর্মজীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিংয়ে তিনি ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ, সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
গোপালগঞ্জ পোস্টিং ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ : অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরির শুরুর দিকেই রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং বাগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পান আবুল খায়ের। তৎকালীন সচিব শহীদুল্লাহর বিশেষ সুপারিশে ছাত্রলীগের কর্মী পরিচয় ব্যবহার করে তিনি গোপালগঞ্জ জোনে প্রভাবশালী পোস্টিং পান—এমন অভিযোগ রয়েছে।
সেখানে দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শেখ সেলিম ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ওই রাজনৈতিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে পরবর্তী সময়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও উপেক্ষা করে দপ্তরে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেন—এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
চট্টগ্রামে ৩% কমিশন ও ‘পিসি টেন্ডার’ : চট্টগ্রাম জোনে দায়িত্ব পালনকালে আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ আরও গুরুতর আকার ধারণ করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে ৩ শতাংশ কমিশন দেওয়ার অলিখিত নিয়ম চালু করেছিলেন তিনি। একই সময়ে প্রচলিত ‘পিসি টেন্ডার’ বা পার্সেন্টেজ শেয়ারিং টেন্ডার ব্যবস্থাও নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই সময়ে তিনি একাই প্রায় ১০০ কোটি টাকা আয় করেছেন—যদিও এই অর্থের পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে ঠিকাদারের বিল আটকে দেওয়া, কাজের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া কিংবা কালো তালিকাভুক্ত করার ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। এমনকি নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ বড় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ ঠিকাদারদের ওপরও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
কুমিল্লায় এমপির বিরোধের পর অপসারণ : চট্টগ্রামের পর কুমিল্লা জোনেও নিজের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন আবুল খায়ের—এমন অভিযোগ রয়েছে। সেখানে টেন্ডার ও কমিশন বাণিজ্য নিয়ে তৎকালীন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের সঙ্গে তার বিরোধ সৃষ্টি হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। একপর্যায়ে এমপি বাহারের তীব্র আপত্তির মুখে তাকে কুমিল্লা জোন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়—এমন তথ্যও অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে।
রংপুরে ঘুষবাণিজ্যের অভিযোগ, গণমাধ্যমে ঠিকাদারদের ক্ষোভ : রংপুর জোনে বদলি হওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ থামেনি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। অভিযোগের প্রতিবাদে স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদার গণমাধ্যমের সামনে মুখ খোলেন। এমনকি বেসরকারি টেলিভিশন ৭১ টিভি-তে ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে সরাসরি লাইভ সাক্ষাৎকার দেন বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ ঘটনা সত্য হলে তা তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ওই সময়ের অভিযোগ ও বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
ন্যাশনাল হাউজিংয়ে ৫০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ : গণপূর্তের বিভিন্ন দায়িত্বের পাশাপাশি ন্যাশনাল হাউজিং অথরিটিতে দায়িত্ব পালনকালেও আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সরকারি প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ, নকশা অনুমোদন এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৫০ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। এ অর্থের সঙ্গে আবুল খায়েরের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, বরাদ্দের কাগজপত্র ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
ঢাকায় ‘মিস্টার ৫%’ পরিচিতি : বর্তমানে ঢাকা জোনে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের দাবি।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প অনুমোদন, কাজের ছাড়পত্র কিংবা ঠিকাদারদের বিল পাস—বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কমিশন দেওয়ার অলিখিত চাপ রয়েছে। এ কারণেই ‘মিস্টার ৫%’ নামটি এখন দপ্তরের ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বহুল আলোচিত বলে দাবি তাদের।
২৪ ফ্ল্যাট, পূর্বাচল ও ময়মনসিংহে বিপুল সম্পদের অভিযোগ : আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তার কথিত বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ নিয়ে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় তার নিজের নামে এবং স্বজনদের নামে অন্তত ২৪টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। ন্যাশনাল হাউজিং ও পূর্বাচলে জমি এবং মোহাম্মদপুরে ন্যাশনাল হাউজিংয়ের বড় ফ্ল্যাটসহ পূর্বাচলে একাধিক কোটি টাকা মূল্যের প্লট ও জমি রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। শুধু রাজধানী নয়, ময়মনসিংহের বিভিন্ন গ্রামীণ ও শহরতলি এলাকায় তার নামে-বেনামে বিঘার পর বিঘা কৃষিজমি ও খামারবাড়ি রয়েছে—এমন অভিযোগও উঠেছে। এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস এবং আয়কর নথির সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চাকরির শেষ সময়ে প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার দৌড় : সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে—চাকরির বয়স যখন মাত্র এক মাসের মতো অবশিষ্ট, তখনও প্রধান প্রকৌশলীর পদে বসার জন্য আবুল খায়েরের কথিত তৎপরতা। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে সরানোর জন্য বিভিন্ন মহলে তদবিরের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা চালানোর চেষ্টা করছেন তিনি। একই সঙ্গে মন্ত্রী, সচিব ও সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও রয়েছে। এ অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন উঠছে—চাকরির শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে একজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কেন প্রধান প্রকৌশলীর পদ পাওয়ার জন্য এত মরিয়া? এই পদ ঘিরে কী ধরনের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বার্থ কাজ করছে?
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ : গণপূর্ত অধিদপ্তর রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। হাজার হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো প্রকল্প, সরকারি ভবন, হাসপাতাল, আবাসন ও রাষ্ট্রীয় স্থাপনা নির্মাণে এ অধিদপ্তরের ভূমিকা রয়েছে।
ফলে একজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে যদি বছরের পর বছর ধরে কমিশন বাণিজ্য, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার এবং বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের কাছে তাই প্রশ্ন—আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ কি কখনো নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে? তার নামে ও স্বজনদের নামে থাকা কথিত ২৪টি ফ্ল্যাট, পূর্বাচলের সম্পদ এবং ময়মনসিংহের জমির অর্থের উৎস কি যাচাই করা হয়েছে? বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করা জোনগুলোতে তার বিরুদ্ধে ওঠা কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগের কোনো তদন্ত হয়েছে কি?
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি : অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে তার আয়কর রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমি-ফ্ল্যাটের দলিল এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর টেন্ডার ও বিলের নথি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ও অর্থের উৎস অনুসন্ধানেরও দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও গণপূর্তের সৎ কর্মকর্তারা।
অভিযোগের সত্যতা তদন্তেই নির্ধারিত হবে। তবে অভিযোগগুলো যদি সত্যের কাছাকাছি হয়, তাহলে একজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে ঘিরে শুধু একটি পদ দখলের লড়াই নয়—গণপূর্তের হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়নকাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এ কারণেই বিষয়টি দ্রুত আমলে নিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

