
ডেস্ক নিউজঃ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এর প্রথম ইউনিটে (ইউনিট-১) মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) থেকে নতুন পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। এটি দেশের কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন-এর সাবেক চেয়ারম্যান এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রথম প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর।
ড. শৌকত আকবরের নেতৃত্ব ও দূরদর্শী পরিকল্পনার হাত ধরেই দেশে এই বৃহৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর রচিত হয়। তার দীর্ঘদিনের নিরলস প্রচেষ্টা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় আজ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকে পৌঁছাতে যাচ্ছে।
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ইউনিট-১ এর জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন-কে জ্বালানি লোডিংয়ের লাইসেন্স প্রদান করে।
ড. শৌকত আকবর জানান, জ্বালানি লোডিং একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালন পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এর মাধ্যমে প্রকল্পটি নির্মাণপর্ব থেকে পরিচালনপর্বে প্রবেশ করে। এই প্রক্রিয়ায় ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টরে নতুন জ্বালানি প্রবেশ করানো হবে, যা পরবর্তীতে প্রথম তাপ উৎপাদন এবং নিউক্লিয়ার চেইন রিঅ্যাকশন শুরু করার পথ তৈরি করবে—বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগে যা শেষ ধাপগুলোর অন্যতম।
বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. শৌকত আকবর বাংলাদেশে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশের প্রথম রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রকল্পের প্রথম প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তার নেতৃত্ব, পরিকল্পনা ও অব্যাহত প্রচেষ্টার দৃশ্যমান প্রতিফলন ঘটতে শুরু করবে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) থেকে, যখন রূপপুর প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে নতুন পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হবে।
কীভাবে রূপপুর প্রকল্পে ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে এবং এ প্রক্রিয়ার প্রযুক্তিগত ও পরিচালনাগত বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন ড. শৌকত আকবর। তার সেই ব্যাখ্যা নিচে তুলে ধরা হলো—
ইউনিট-১ এর নতুন পারমাণবিক জ্বালানি
নতুন পারমাণবিক জ্বালানি মূলত লো-এনরিচড ইউরেনিয়াম (যাতে ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর মাত্রা ২.৪% থেকে ৪.৯৫%) থেকে তৈরি ইউরেনিয়াম ডাই-অক্সাইড পেলেট দিয়ে গঠিত। কয়লা বা তেলের মতোই এসব পেলেট তাপ উৎপন্ন করে, যা থেকে বিদ্যুৎ তৈরি হয়। প্রতিটি পেলেটের ওজন মাত্র ৪.৫ থেকে ৫ গ্রাম, কিন্তু শক্তি উৎপাদন ক্ষমতায় এটি প্রায় এক টন কয়লার সমপরিমাণ। একটি মাত্র জ্বালানি পেলেট কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশের একটি সাধারণ পরিবারের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম—তাও কোনো কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই।
এই পেলেটগুলো জিরকোনিয়াম অ্যালয়ের নল, অর্থাৎ ফুয়েল রডে রাখা হয়, যা বিকিরণ প্রতিরোধে সুরক্ষাবর্ম হিসেবে কাজ করে। এসব ফুয়েল রড কয়েক বছর রিঅ্যাক্টরের কোরে অবস্থান করে, এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী বদলানো হয়।
একাধিক ফুয়েল রড একত্রে একটি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি গঠন করে। প্রতিটি অ্যাসেম্বলির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪.৬ মিটার এবং এতে প্রায় ৫৩৪ কেজি লো-এনরিচড ইউরেনিয়াম ডাই-অক্সাইড থাকে। স্টিল ও জিরকোনিয়ামসহ প্রতিটি অ্যাসেম্বলির মোট ওজন প্রায় ৭৫০ কেজি, এবং এতে ৩১২টি ফুয়েল রড থাকে।
ইউনিট-১ এর রিঅ্যাক্টর কোরে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি ব্যবহার করা হবে, যেগুলো পানি দিয়ে শীতল রাখা হবে। প্রথম ধাপে অতিরিক্ত একটি সহ মোট ১৬৪টি অ্যাসেম্বলি ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায়। এতে করে জ্বালানি লোডিংয়ের আগে প্রয়োজনীয় পরিদর্শন, গুণগত মান যাচাই, কাঠামোগত অখণ্ডতা পরীক্ষা এবং জ্বালানি হ্যান্ডলিং ও লোডিং বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রস্তুতির সুযোগ তৈরি হয়।
প্রথম জ্বালানি লোডিং বলতে কী বোঝায়?
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, প্রথম পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং হলো নতুন নির্মিত রিঅ্যাক্টরের কোরে প্রথমবারের মতো ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন করা। এই ধাপ থেকেই একটি রিঅ্যাক্টর নির্মাণপর্ব অতিক্রম করে বাস্তবিক অর্থে পরিচালন সক্ষম বিদ্যুৎকেন্দ্রে রূপ নিতে শুরু করে।
ভিভিইআর ধরনের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কমিশনিং টেস্ট সাধারণত দুই ধাপে সম্পন্ন হয়
১. প্রি-অপারেশনাল টেস্ট এবং
২. অপারেশনাল (নিউক্লিয়ার) টেস্ট।
প্রি-অপারেশনাল ধাপে জ্বালানি প্রবেশের আগেই কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি, উপাদান ও বিভিন্ন সিস্টেম পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। এসব পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর, পরিচালনকারী সংস্থা তা পর্যালোচনা করে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের জন্য জমা দেয়। অনুমোদন পাওয়ার পরই জ্বালানি লোডিং শুরু করা যায়।
প্রথম জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য প্রস্তুতি বলতে কী বোঝায়?
এটি হলো- মানবসম্পদ, যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিচালন প্রক্রিয়া, জরুরি পরিকল্পনা এবং সহায়ক জাতীয় কাঠামোসবকিছু জ্বালানি প্রবেশের জন্য প্রস্তুত আছে—এমন আনুষ্ঠানিক ও নথিভুক্ত নিশ্চিতকরণ।
এর মধ্যে রয়েছে
• নিরাপত্তা ও নকশা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়া
• পরিচালনকারী সংস্থার পূর্ণ প্রস্তুতি নিশ্চিত হওয়া
• সব প্রি-অপারেশনাল কমিশনিং টেস্ট সম্পন্ন ও অনুমোদিত হওয়া
• প্রশিক্ষিত ও অনুমোদিত জনবল প্রস্তুত থাকা
• পরিচালন নির্দেশিকা ও নথিপত্র চূড়ান্ত হওয়া
• নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক সেফগার্ড অবকাঠামো নিশ্চিত হওয়া
• BAERA-সহ প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন পাওয়া
• IAEA-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়ন সম্পন্ন হওয়া
• ডামি ফুয়েল দিয়ে মহড়া ও রিফুয়েলিং যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা যাচাই করা
জ্বালানি লোডিংয়ের সময় কী ঘটে?
এই প্রক্রিয়ায় প্রশিক্ষিত বাংলাদেশি অপারেটর ও ফুয়েল হ্যান্ডলাররা রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় বিশেষায়িত ফুয়েল লোডিং মেশিন ব্যবহার করে একে একে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি রিঅ্যাক্টরের কোরে স্থাপন করবেন।
পুরো প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করা হবে, যাতে রিঅ্যাক্টর সাব-ক্রিটিক্যাল অবস্থায় থাকে। একই সঙ্গে পুরো সময়জুড়ে নিউট্রন মনিটরিং সিস্টেম সক্রিয় থাকবে।
তবে এই ধাপে পৌঁছানোই শেষ নয়। একটি দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় যাওয়ার এই সময়টিই সবচেয়ে জটিল পর্যায়গুলোর একটি। এতে শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতাই নয়, প্রয়োজন দক্ষ পরিচালন সংস্থা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত সহায়ক অবকাঠামো।
বাংলাদেশের মতো নতুন পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের জন্য নির্মাণপর্ব থেকে নিরাপদ, স্বাধীন ও টেকসই পরিচালনায় উত্তরণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং পরিচালনকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব।

