
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর রাস্তায় আবারও নেমেছে ক্ষুব্ধ তরুণসমাজ। যে সরকারকে মাত্র কয়েক মাস আগে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছিল দেশের ‘জেন-জি’ বা নতুন প্রজন্ম, আজ সেই সরকারের বিরুদ্ধেই শুরু হয়েছে তীব্র জনরোষ। কাঠমান্ডুর সিংদরবার সচিবালয়ের বাইরে জড়ো হয়ে শত শত মানুষ ‘গরিবের ওপর অত্যাচার বন্ধ করো’ এবং ‘মানবাধিকার রক্ষা করো’ স্লোগানে উত্তাল করে তুলেছে রাজপথ।
সাম্প্রতিক এই গণবিক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছে ২৫ বছর বয়সী এক রাইড-শেয়ারিং চালকের মর্মান্তিক আত্মাহুতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে। গত সপ্তাহে কাঠমান্ডুর রাস্তায় এক মক্কেলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন গণেশ নেপালি নামের ওই যুবক। সে সময় পৌর পুলিশ এসে আকস্মিকভাবে তার মোটরসাইকেলের চাকায় লক লাগিয়ে দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এই হয়রানির প্রতিবাদে এবং চরম হতাশায় গণেশ নিজের শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই ট্র্যাজেডিই মেয়রের প্রশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করেছে।
আন্দোলনকারীরা কেবল এই হত্যাকাণ্ডের বিচারই চাচ্ছেন না, বরং দরিদ্র ও বস্তিবাসীদের ওপর চলমান রাষ্ট্রীয় জুলুম বন্ধের দাবি জানাচ্ছেন। বিশেষ করে নদীতীরের সুকুমবাসী বা ভূমিহীনদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং ফুটপাতের হকারদের ওপর ধারাবাহিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা।
২০২২ সালে কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে বালেন্দ্র (বালেন) শাহ নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই সেখানকার নগর পুলিশের এমন আগ্রাসী মনোভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। ফুটপাত পরিষ্কার এবং অনানুষ্ঠানিক বাজার উচ্ছেদে মেয়রের কঠোর ও আপসহীন নীতি প্রায়ই সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহিংস সংঘর্ষের রূপ নিয়েছে। সমালোচকদের মতে, শহরের দরিদ্রতম মানুষদের প্রতি প্রশাসনের ন্যূনতম সহানুভূতিও অবশিষ্ট নেই।
আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় প্রশাসন সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে তাদের সাংবিধানিক সীমার বাইরে গিয়ে কাজ করছে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মতে, আইন অনুযায়ী পৌর পুলিশ কোনোভাবেই শারীরিক বলপ্রয়োগ বা দাঙ্গা দমনের মতো ক্ষমতা রাখে না। তাদের মূল কাজ হলো নাগরিক সহযোগিতা, পরিচ্ছন্নতা তদারকি এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা। ট্রাফিক বা রাস্তা অবরোধের মতো বিষয়গুলো সরাসরি ট্রাফিক পুলিশের কাছে পাঠানোর নিয়ম থাকলেও, পৌর পুলিশ নিজেরা গিয়ে হকারদের ধাওয়া করছে, ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করছে এবং সাধারণ মানুষকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করছে।
অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তারাও স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, কোনো পরিস্থিতি যদি জনশৃঙ্খলার পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়, তবে পৌর পুলিশ আইনগতভাবে নেপাল পুলিশের সাহায্য নিতে বাধ্য, নিজেরা বলপ্রয়োগ করতে পারে না। তা সত্ত্বেও দিনের পর দিন দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল মানুষদের ওপর এমন জুলুম চালানো হচ্ছে, যার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে মাত্র কয়েক মাসের মাথায় যে তরুণরা বুক ভরা আশা নিয়ে এই সরকারকে ক্ষমতায় এনেছিল, আজ তারাই জবাবদিহিতা আর অধিকার আদায়ের দাবিতে আবার রাজপথে নেমে এসেছে।

