সচিবালয়ে বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগ

এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ সচিবালয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মূলত ক্ষমতাসীন দলের একটি অঙ্গসংগঠনের এক শীর্ষ নেতাসহ দুই জন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবকে একটি তালিকা ধরিয়ে দিয়ে পিডি পরিবর্তনের জন্য চাপ দিয়েছিলেন। সূত্র জানায়, পিডি পদে পছন্দের কর্মকর্তাদের বসানোর জন্য কোটি কোটি টাকা লেনদেনের গোপন চুক্তিও হয়। এমনকি কয়েক জন কর্মকর্তার কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, যারা সচিবকে পিডি পরিবর্তনের জন্য চাপ দিয়েছিলেন, তারা প্রায় প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবের পিএসের রুমে বসে থাকেন। সচিব কিংবা মন্ত্রীর রুমে কোন ফাইল যাচ্ছে তার ওপর নজর রাখেন। সচিবের রুমে ফাইল ঢোকার আগে তারা সেটা দেখতেন, তাদের জানার বাইরে কোনো ফাইল যাচ্ছে কি না। কোনো ফাইল তাদের পছন্দ না হলেই সেটি আর আলোর মুখ দেখত না। এছাড়া ব্যক্তিগত পদায়ন ও বদলি-বাণিজ্যের তদবির তো আছেই। এসব কার্যক্রম দেখে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অসন্তুষ্ট। শুধু কর্মকর্তারা নন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-সচিবও খুবই বিরক্ত ও বিব্রত। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছেন না। জানতে চাইলে একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, একটা মানুষ প্রায় প্রতিদিন সকাল থেকে অফিস ছুটি হওয়া পর্যন্ত এখানে বসে থাকেন। আমরা সবই দেখি এবং বুঝি। কিন্তু কিছু বলতে পারছি না। কিছু বলতে গেলে তো আমাদেরই চাকরি যাওয়ার ভয় আছে। কারণ তারা তো ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে।
এদিকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে কোনো কিছু না জানিয়ে সরকারি সফরসূচি তৈরি করে একটি উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় ও খাদ্যগুদাম পরিদর্শনে যান মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও)। পরে বিষয়টি জানতে পেরে চরম বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হন মন্ত্রী। ক্ষুব্ধ মন্ত্রী প্রথমে মৌখিকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন তার এপিএসকে। এক সপ্তাহ পর সরানো হয় ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকে। ঐ সফরে কয়েক জন সরকারি কর্মকর্তাও গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। গত সপ্তাহের এই ঘটনায়ও সচিবালয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। একইভাবে সম্প্রতি আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বড় মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রীর পিএস ও এপিএসকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, তাদের দুই জনের বিরুদ্ধেও তদবির ও বদলিবাণিজ্যের অভিযোগ ওঠেছিল।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা বিএনপি সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ একটি প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার। কিন্তু সচিবালয়ের ভেতরে বদলি-বাণিজ্য, তদবির ও প্রভাব বিস্তারের অদৃশ্য রাজনীতি যেন অনেকটা আগের ছন্দেই চলছে। কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর প্রভাবশালী পিএস, এপিএস ও ঘনিষ্ঠ সহকারীদের ঘিরে গড়ে ওঠা অঘোষিত এই ক্ষমতার বলয় নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতি থেকে শুরু করে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগে প্রভাব, ফাইল নিষ্পত্তি ও কমিশন আদায়ের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ নিয়মিতই সামনে আসছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও সচিবালয়ে প্রতিদিন ভিড় করছেন তদবিরকারী, দালাল ও সুবিধাভোগী চক্রের লোকজন।
গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব নিয়ে বিস্তর সমালোচনা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও প্রশাসনের ভেতরে একই ধরনের অভিযোগ ওঠে। এখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এলেও প্রশাসনের সেই চিরচেনা সংস্কৃতি বদলের বার্তা এখনো স্পষ্ট নয়। প্রশাসনের ভেতর দীর্ঘদিনের অনানুষ্ঠানিক প্রভাব কাঠামো ও সুবিধাভোগী চক্র ভাঙা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, সচিবালয়ে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সুপারিশ, তদবির ও ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজের জন্য প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে ঘোরাঘুরি করছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সচিবালয়ের বিভিন্ন ভবনের করিডর, মন্ত্রীর দপ্তরের সামনে কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কক্ষের আশপাশে অপেক্ষা করতে দেখা যায় তাদের।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক তদবির সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরেই গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে অনেকেই বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। বিশেষ করে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপদেষ্টাদের পিএস, এপিএস এবং ঘনিষ্ঠ স্টাফদের আশপাশে এসব তদবিরকারীদের আনাগোনা বেশি দেখা যায়।
সচিবালয় সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে ফাইল দ্রুত করানো, নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়। এতে স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কর্মকর্তারাও নানা ধরনের অঘোষিত চাপের মুখে পড়েন।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের অভিযোগ, ফাইল ছাড়, বদলি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পদায়নে এসব ব্যক্তিদের ‘সবুজ সংকেত’ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে কাজ এগোচ্ছে না। তবে ব্যতিক্রমও আছে কয়েকজন মন্ত্রীর ক্ষেত্রে। জানা গেছে, কয়েক জন মন্ত্রী অনাকঙ্ক্ষিত বিতর্ক ও সমালোচনা এড়াতে এবং নিজের ও মন্ত্রণালয়ের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি বজায় রাখতে পিএস ও এপিএস নিয়োগ দেননি। তাদের কাজ মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কর্মকর্তারাই করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক নিয়োগে স্বচ্ছতা, পিএস-এপিএসদের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ, সম্পদের বাধ্যতামূলক হিসাব এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ডিজিটাল ট্র্যাকিং না আনলে একই চিত্র বারবার ফিরে আসবে। এ বিষয়ে সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, এই সময়ে প্রশাসনিক কাজে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নিয়োগ কিংবা বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ থাকাটা দুর্ভাগ্যজনক। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতিটি সরকারের সময়ই ক্ষমতার কেন্দ্র ঘিরে একটি ‘অদৃশ্য প্রভাব বলয়’ ছিল, যারা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে অনানুষ্ঠানিক প্রভাব খাটিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান সরকারকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী যদি প্রশাসনকে সুশৃঙ্খলভাবে রাখতে চান, তাহলে এগুলো কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। সাবেক এই সচিবের মতে, প্রশাসনের ভেতরে যদি অদৃশ্য প্রভাব বলয় গড়ার সুযোগ কেউ পায়, তাহলে গণঅভ্যুত্থান, পরিবর্তন কিংবা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি সবই শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে আস্থাহীনতায় পরিণত হবে।

